উপন্যাস।।পার্পল সন্ধ্যা।। হামিম কামাল।। পর্ব তিন

উপন্যাস পার্পল সন্ধ্যা

হামিম কামাল

অধ্যায় ২ এর সার সংক্ষেপ : ঘরে স্থির হয়েছে রুপাই আর সাহস। জিনে চুমুক দিতে দিতে, সলফেজিও সুরের আবহে সাহস অভ্রের গল্প শুনতে প্রস্তুত হলো। মিরাইকে দেখার গল্প।

অধ্যায় ৩

অভ্রের স্মৃতি মানেই সেই অশথচাঁপা গাছ, পৃথিবীর প্রস্থচ্ছেদের মতো দেখতে যার ক্যানোপি। কা-টা দশতলা দালানের সমান উঁচু। গোড়াটা এমন যেন ছয়টা হাতিকে পিঠাপিঠি বসিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। লতিয়ে, ফেনিয়ে বেড়ে উঠে, ডাল-পালা ফুল-পাতা ছড়িয়ে ছায়া-ছায়া আলো-আলো করে রেখেছে সে অভ্রের ভুবন। গোড়ার দিকটা মেঘে ডোবা। বেলা বদল হওয়ার সাথে সাথে সেই মেঘ রঙ বদল করে। সকালে নীল, দুপুরে সোনালী, সন্ধ্যায় কখনো পার্পল কখনো লাল, রাতে সাদা।

“আজ তো পৌষের সাত তারিখ। না?” বলল রুপাই।

আমি বললাম, “নয় তারিখ।”

“অশথচাঁপার ফুল প্রায় ঝরে গেছে।”

“হ্যাঁ, কার্তিক-অগ্রহায়নে ঝরতে শুরু করে, বলেছ।”

বলছে রুপাই। ডালে ডালে দুলছে ছোট ছোট ফল, হালকা বেগুনির ওপর হলুদ হলুদ ছোপ। যেন কোনো বেগুনি কোয়েল এসে ডিম পেড়ে গেছে। এখানে ফল খেতে আসে কিছু কমলাবউ পাখি, আগেও দেখত রুপাই, আজও দেখল। “পিড়িং পিড়িং” ডাকছে ওরা, আর টুকটুক খাচ্ছে। আর সপ্তাহ দুই পর ফল ফেটে যাবে। তখন অশথচাঁপার কয়েক লক্ষ বীজ ছড়িয়ে যাবে অভ্রের মেঘে, টিকবে একটা কি দুটো। হয় উত্তরে যাবে, নয় দক্ষিণে। হয়ত পূর্বে যাবে,নয় পশ্চিমে। মা গাছের সঙ্গে আর কোনো দিন দেখা হবে না।

“আমি আর মিরাই একবার আরেকটা অশথচাঁপার গাছ খুঁজতে হাজার মাইল পাড়ি দিয়েছি। পাই নাই। অবশ্য অভ্রের দেশ তো লুকোচুরির দেশ। কাল যেখানে কিছু দেখে যাবা, পরদিন সেখানে এসে তাকে পাবা না। মেঘ চলে, সঙ্গে দৃশ্যও চলে।”

“তাহলে এই অশথচাঁপাকে বারবার কিভাবে পেতে?”

“এটা আমাদের নিয়তি।”

এরপর রুপাই তাকাচ্ছিল এদিক-সেদিক, উত্তর-পূর্বে সেই অবলাল পর্বত। পেছনে অশথচাঁপার পাতা নড়ার শব্দ, ঝিরিঝিরি ঝমঝম! অবলাল পর্বতের পথে দূরে দূরে স্বর্ণলতা, বনদুর্বা, আর কাশ। মেঘের মাটির রঙ দেখতে দেখতে পার্পল রঙ নিচ্ছে। চারপাশে চোখ ফেলে মনে মনে মিরাইকে খুঁজছে রুপাই। সূক্ষ্মশরীরে মন থাকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। পশ্চিম দিকে তাকাল। অবনীল পর্বত। ওই পর্বত ছিল রুপাই আর মিরাইয়ের চড়–ইভাতি পর্বত।

“সাহস, এখানে ছয় বছর মানে জানো তো?” বলল রুপাই।

“মানে অভ্রে প্রায় ছয়শ বছর পার হয়ে গেছে,” আমি বললাম।

“হ্যাঁ। এখানে মিরাইকে হারিয়েছি ছয় বছর। ওখানে ওর স্মৃতিগুলো ছয়শ বছর পেছনের। তো, দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় পিছনে খরর খরর শব্দ। নরসিংহকে মনে আছে?”

“তিনি তো অশথচাঁপার বাকল বেটে স্মৃতিভ্রমের ওষুধ বানাতেন,” আমি বললাম।

“হ্যাঁ তিনি।”

নরসিংহ অংশু বারো ফুট উঁচু দেহের কথা শুনেছি। কিন্তু রুপাই যাকে দেখল, সে দশ ফুটে ঠেকেছে। বার্ধক্যে হাড় ক্ষয় হয়ে উচ্চতা গেছে কমে। যে সোনালি উজ্জ্বল কেশর সূর্যালোকের মতো ছড়িয়ে থাকত, তা শীতল হয়ে বসে গেছে। পরনে পুরনো দিনের মতো সোনালি মসলিনের কাপড় নেই, বরং সাদা খদ্দরের চাদর, সুতির নীল ধুতি।

ধীরে ধীরে অশথচাঁপার আড়াল থেকে তার পুরো শরীর বের হয়ে এলো। নরসিংহের গলায় লালরঙা সূর্যমুখীর মালা। লাল সুর্যমুখী অবনীলের পশ্চিমপ্রান্তে হতো, দুর্গম ছিল পথ। কত হেঁটেছে রুপাই, মিরাই।

নরসিংহের দুই হাত নাভির কাছে জড়ো। পুষ্ট লাল মরিচের মতো নখ। আরো দুটো হাত মাথার ওপর জড়ো হয়ে আছে। বললেন, “তুমি আসবে, জানতাম।” মেঘডাকা স্বর। 

“শুভবিকাল অংশু!”

“বিকালগুলোতেও আগের মতো ব্যস্ত থাকি না আর, সুতরাং শুভবিকাল।”

“ব্যস্ততা নেই কেন?” রুপাইয়ের প্রশ্ন। “অভ্রে কি স্মৃতিভ্রম কমে গেছে?”

“কমলে অভ্রও থাকবে না। তবে চিকিৎসার সব দায় আর একা নিচ্ছি না, এই হলো ব্যাপার।”

“শিষ্য?”

“সেরকমই।”

“কিভাবে জানতেন আমি আসব?”

নরসিংহ না, অন্যকেউ বলল, “ও যে সারাক্ষণ তোমাকে ডাকছে।” রুপাই তাকিয়ে দেখে অংশুর পাশে এক বৃদ্ধা নৃসিংহী।

“আলো!” রুপাই প্রায় চিৎকার করে উঠল। “কখন এলেন?”

“ছিলাম ওর সঙ্গেই।” আলো হাসল।

স্নেহময়ী সিংহীমুখ। নদীর ঢেউয়ের মতো লাল চুল নেমে এসেছে কোমর পর্যন্ত। চুল ছিল আগুনের মতো লাল। এখন হয়েছে জমাট রক্তের মতো মেরুণরঙা। পরনে আগের মতোই লাল মসলিনের শাড়ি। গলায় পায়রাময়ূরের পেখমপুচ্ছের মালা। মুখে বলিরেখা পড়েছে, ত্বকও শিথিল হয়ে এসেছে। চোখে উজ্জ্বলতা আজো কমেনি।

পৃথিবীর পশ্চিম দিগন্তে ডোবার প্রস্তুতি নিচ্ছে সূর্য। পেছন থেকে আসা তার আলোয় দুজনের দেহরেখা জ্বলজ্বলে হয়ে আছে। 

নৃসিংহী তাঁর মাথার ওপর দুহাত জড়ো করলেন, আর বাকি দুহাত জড়ো করলেন বুকের কাছে। একটা বৃত্ত তৈরি হলো, বৃত্ত দিয়ে সূর্যের আলো আসছে। সোনালি আলোর সেই জমাট সরোবরের ভেতর একটা শুভ্র দেহের নড়াচড়া চোখে পড়ল। যেন কেউ দুলছে। জলের নিচে শ্যাওলা যেমন দোলে। সেই দেহরেখাজুড়ে সূর্যের আলো।

রুপাই সেই দেহটিকে চেনার আশায় একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। দেহটা থেকে থেকে লতার আকার নিচ্ছে, আবার মানবীর। এরপর আগুণের শিখার আকার ধরছে, তারপর পাখির ডানার।

নৃসিংহী বলল, “চিনতে পারছ না?”

“না।”

“আলোর কারণশরীর।”   

সূর্যের আলো মিরাইয়ের কারণশরীর ভেদ করে চলে যাচ্ছে। “সূক্ষ্মশরীর কোথায়?” ব্যগ্র হয়ে উঠল রুপাই।

প্রত্যেকে তার উদ্দেশ্য থেকে কথা সাজায়। সূক্ষ্ম আর কারণশরীর মিলে আত্মা। আত্মা স্থূলদেহে প্রবেশ করলে মানুষ জেগে ওঠে। মিরাইকে ফিরিয়ে আনার আশা এখনো ধরে রেখেছে রুপাই।

আলো বলল, “তুমি ওর স্থূলশরীর বাঁচাতে পেরেছ?”

“পেরেছি।”

নৃসিংহী হাসল। “বেশ, মিরাইয়ের কারণশরীর কিন্তু ডাকছে তোমাকে সারাক্ষণ। তুমি শোনেনি নিশ্চয়ই।”  

কারণশরীরের ডাক শোনে কেবল কারণশরীর। রুপাইয়ের কারণশরীর, সূক্ষ্মশরীরের সঙ্গে মিলে আহিত অবস্থায় আছে। মিরাইয়ের ডাক তার শোনার কথা না। তবে অনুভব করার কথা।

হঠাৎ মিরাইয়ের কারণশরীর থেকে ফিরোজা আলো বেরোতে থাকল। ধীরে ধীরে নারীর অবয়বটা একটা পেতলের কলসের আকার নিলো। কলসের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো শেকড়ের মতো উপাঙ্গ। প্রায় এক মিনিট ধরে তারা বেরোল। তারা লতার মতো ওপরের দিকে ছুটেছে। দেখতে দেখতে ওপরের প্রায় ত্রিশ বর্গফুট অংশের শূন্যস্থান শেকড়ে ছেয়ে গেল।

হঠাৎ এ দৃশ্যবদলে রুপাই অবাক। কারণশরীরও কি এমন আকারবদলের ক্ষমতা রাখে? এমন প্রতীক দেখানোর ক্ষমতা রাখে? অস্তিত্ব যখন হুমকির মুখে, তখন প্রত্যেকের তার সাধ্যের সবটা দেখাতে ব্যগ্র থাকে। মিরাইয়ের কারণশরীরও তাই।

রুপাইয়ের সূক্ষ্মচোখের মণিতে শেকড়ের ছায়া। এমন সময় আলো বললেন,  “তোমার অশথচাঁপার গেছো শামুকদের মনে আছে? রুপাই?”

“মিরাইয়ের শরীরটা কুচাইতলীর মেডিকেল কলেজে আছে আলো। আপনি ওর সূক্ষ্মশরীর কোথায় আমাকে একবার শুধু বলে দেন। আমি ওকে ফিরিয়ে আনবই।”

আলো হেসে বললেন, “বেশ। তার আগে যাদের কারণে মিরাইয়ের কারণশরীরের কাছে আসতে পেরেছ তাদের একটু ভালোবাসা তো জানাও!”

“কারা ওরা?”

“তাদের কথাই তো বলছি। ফুলিকা শামুকদের মনে আছে কিনা।”

আলো আর অংশু এরপর বলতে শুরু করল আদ্যপান্ত, কোথায় কী ঘটেছে। পৃথিবীতে কী ঘটার ধারায় অভ্রে কী ঘটল, আর অভ্রে কী ঘটল বলে আবার পৃথিবীতে কী ঘটেছে। আমি শুনতে শুনতে ঘটনার আঁজেভাঁজে এমন মিলিয়ে গেলাম, বাস্তবতা মিশ্র হয়ে ধরা দিলো। 

আমি আর রুপাই তখন কাশবনে মাত্র পা রেখেছিলাম। পৌষের শুরু যেহেতু, পরিযায়ী পাখিরা মেঘের মতো আসছিল, যেন টুকরো টুকরো মেঘ। এদের ভেতর মেঘের দুটো টুকরো ছিল খন্তা আর গিরিয়া হাসের। খন্তা হাসের দলে ওরা ছিল একুশটি, গিরিয়া হাসের দলে আটটি। সংখ্যাটা কল্পনা করেছি। পাখিরা দলে ফিবোনাচি নম্বর মেনে থাকে।

ফিবোনাচি নিয়ে নড়চড় বেশি ছিল রুপাইয়ের। জীবনে প্রেম, অভিযানসহ নানা কিছুতে রুপাই ফিবোনাচির সাক্ষর রাখতে চাইতো। সিরিজটা আমার খারাপ লাগত না। কিন্তু অসীম ধারা নিয়ে যে কোনো অংক কষা আমার অসহনীয় বোধ হতো।

আলোর কথায় কল্পনা করছি, বিকেল যখন আরো একটু পাকা হয়ে ওঠার মুখে, গিরিয়ার বড় দলটা তখন খন্তার দল থেকে আলাদা হয়ে খানিকটা পূর্ব দিকে চলে এসেছে। গিরিয়ার দলে একটা হাঁস ছিল মেয়ে। ওরা তুরাগ নদের আকাশ পেরোচ্ছিল, নিচে তুরাগে চর, চরে ধানগাছ, কূলে মানুষ। ওরা বোটানিকাল গার্ডেনের দিকে উড়ল। খন্তার দল সেদিকে ঘুরল না, চলে গেল বিরলিয়ার দিকে।

গিরিয়ার দলটা যেতে যেতে নিচে পড়ল এক সবুজ সরোবর, চারদিকে গাছ, ঘাস, সবুজ অন্ধকার। নিয়মিত বিরতিতে বসানো সাদা পাথরের বেঞ্চগুলোয় কোনো মানুষ নেই। সরোবারটা ঘিরে আছে বোটানিকাল গার্ডেনের টুম্পা রাস্তা। নির্জন।

মিরাইয়ের কারণশরীর যেভাবে ডাক পাঠাচ্ছে তা কিন্তু নাম ধরে “রুপাই রুপাই” ডাক না। ভাষায় এ ডাক ব্যক্ত হয় না। ভাষার প্রাণিরা তাই শুনতে অপারগ। ভাষার বাইরে যে অধিভাষা, সেই অধিভাষার প্রাণিরা এ ডাক শুনতে পায়। মানুষ পৃথিবীতে প্রায় চল্লিশ হাজারেরও বেশি সময় আগে অধিভাষা জানত। এখন সেখান থেকে সরে এসেছে বহুদূর। অতএব ভরসা এখন নরসিংহ, নৃসিংহী, পায়রাময়ূর। ভরসা এখন হিজল, বানরলাঠি, স্বর্ণলতা। ভরসা এখন শীসনাগ, মিনেটর, তিমিঙ্গিল। ভরসা এখন কিন্নরি, এল্ফ, ভ্যালকিয়েরিয়ে। অভ্রের যত বাসিন্দা এরা। এবং শেষ ভরসা ফুলিকা শামুকের দল।

ফুলিকারা যারা সারাটা সময় কর্ষিকা উঁচিয়ে শোক প্রকাশ করছে। মাথা নত করে ওই সহমর্মিতা দেখিয়েছে।

অভ্রে এখন ফলের মৌসুম। বাতাসে খয়েরি নানাক-নিহালি মাছি। আকারে এক মিলিমিটারও না। উড়ে এসে বসছে অশথচাঁপার পাতাজুড়ে। পাতার রন্ধ্র ঢেকে দিচ্ছে। ফুলিকা শামুকদের নড়ে ওঠার সময় এটা। পাতা চেটে পরিষ্কার করে এসময় ওরা নিজেরাও বাঁচে, গাছকেও বাঁচায়। গাছে গাছে তাই চলছিল। অশথচাঁপার শরীরময় আশ্রিত অজস্র ফুলিকা শামুক ঘুরে ঘুরে নানান-নিহালি মাছি পরিষ্কার করছিল।

গিরিয়া হাঁসের দলে মেয়ে হাঁসটি সঙ্গীদের ডাকছে, “ওয়ারেহ! ওয়ারেহ!” সঙ্গীরাও উত্তর দিচ্ছে, “ক্রিক, ক্রিক, ক্রিক, ক্রিক!”

“ওয়ারেহ, ওয়ারেহ!”

“ক্রিক ক্রিক!”

ঝপাঝপ ওরা নেমে এলো নির্জন সরোবরের তীরে। জলের ঘ্রাণে চারপাশ রান। চারদিকে সবুজ বন। বাইরে যেখানে বিকেল, সরোবরের ধারে তখন সন্ধ্যা নেমে গেছে। কারণ বড় বড় গাছে চারপাশ ঘেরাও। সেইসব গাছের ভেতর হিজল আছে, মহুয়া আছে। তাতের পাতার ফাঁকে ফাঁকে বিকালের আলোর হিরে। এদিকে সরোবরে, জলের ধারে ধারে যতটুকু চোখে পড়ে নিরপদ্রুত চাপড়া আর শ্যামাঘাস, ওখানে কোনো মাংসখেকো পশুর অনুপস্থিতি ঘোষণা করছে। ওদিকে আকাশ থেকে নেমে এলো গিরিয়া হাঁসের দল। বেলামিয়া আর পিলা শামুকেরা কপাকপ শিকার হতে থাকল। হাঁসের চ্যাপ্টা পায়ের ছাপ পড়তে থাকল জলের নিচে নরম মাটিতে। মাটি ধুলোর মতো উড়ে বিকৃত হয়ে যেতে থাকল ছ সেই ছাপ। কাঁকড়াগোছা ঘাসের আড়ালে জলের শামুকগুলো লুকোতে চাইছে।

হাঁসের দল থেকে একটু পশ্চিমে স্থির ডুবে ছিল একটা পীতসবুজ বেলামিয়া শামুক। সরোবরের কাদাজলের ভেতর, আধডোবা, জ্যান্ত। গিরিয়া মেয়ে হাসটা ওকে দেখে সশব্দে এগিয়ে গেল।

ওদিকে অভ্রে, অশথচাঁপার পাতায় আর ডালে খসখসে বাকলে লেগে ফেটে গেল নিচ থেকে উঠে আসা কিছু বুদবুদ। একটা বুদবুদভাঙা ঘোড়াপতঙ্গশিশুর ভেজা আত্মাশরীর হাঁপাতে থাকল কালো বাকলের খাঁজে। একটা ব্যাঙের আত্মাশরীর বোকা চোখে তাকাতে থাকল চারপাশে। তার শরীরের একটা পরত স¦চ্ছ সূক্ষ্মশরীর, আরেকটা পরত হালকা ফিরোজা রঙের কারণশরীর। একটা পাতার আড়ালে মুখ লুকোল। মেঘের ভিড়ে জলকণার সঙ্গে উঠে আসা পুঁটি মাছের ডিম আর স্পাইরোগাইরার স্পোর আলো ছড়াচ্ছে।

আবার বোটানিকাল গার্ডেনের সরোবরদৃশ্য। গঠাৎ সরোবরের কিনারে চলল গুলি। একটা বিরাট ম্যাচবাক্সে যেন কেউ ক্রিকেট ব্যাটের সমান দিয়াশলাই ঘসে দিয়েছে। এয়ারগানের শব্দে কেঁপে উঠল পাখিগুলো। গিরিয়া মেয়ে হাঁসটা বেলামিয়া শামুকটাকে তখন সবেমাত্র ঠোঁটে তুলেছে, একটা গিরিয়া হাঁস উড়তে গিয়ে ঝুপ করে পড়ল পানির ওপর।

নখের শব্দ তুলে ছুটে আসতে থাকল একটা কুকুর। “হুফ হুফ হুফ!” একটা হলদে প্যারিয়াহ জাতের কুকুর। ভারতবর্ষের পথেঘাটে যারা নেড়িকুকুর নামে চেনা। বাঁকানো লেজটা আকাশে। চেহারায় একটা প্রভুভক্ত উদ্বেগ। কুকুরটা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

গিরিয়া হাঁসটা উড়তে শুরু করেছে। দলের সাত সদস্যের পা আর ডানা থেকে পানি ঝরছে। বাতাসে শব্দ উঠেছে পাখসাট-পাখসাট! দেখতে দেখতে বোটানিকাল গার্ডেন পেরিয়ে ওরা বাইরে চলে এলো। বাইরে মরা কাশবন। গিরিয়া হাঁসের শক্ত ঠোঁটের নিচে বেলামিয়া শামুকের খোল ফেটে গেছে। শামুকের দেহে আঁচড় ফেলছে হাসের দাঁতের খাঁজ।

ওড়ার পথে গিলে নিতে গিয়ে হঠাৎ শামুকটা ফসকে গেল। হু হু করে নিচে পড়তে থাকল বেলামিয়া। গিরিয়া মেয়ে হাঁসটা খাবারের মায়া ছেড়ে দিলো। কাশের বনে হাঁটছে দুজন মানুষ। নামা অসম্ভব। গুলি থেকে বাঁচা গেছে এই বেশি। হিমালয় পার হওয়ার পর থেকে দলটা কেবল ছোটই হচ্ছে।

অভ্রে, অশথচাঁপার গুঁড়ির কাছে একটা নতুন বুদবুদ এসে থামল। তার ভেতর নরমে ঘুমোচ্ছে এক বেলামিয়া শামুক। তার ফিরোজা কারণশরীরের ওপর পাতলা সূক্ষ্মশরীর, নাড়ির মতো গোলাপি। অশথচাঁপা গাছের দুই ফুলিকা শামুক এগিয়ে গেল বেলামিয়া শামুকের দিকে। বেলামিয়ার আবরণ-বুদবুদে কর্ষিকা ছোঁয়াল।

সঙ্গে সঙ্গে আলাদা হয়ে গেল দুজনের সূক্ষ্ম আর কারণশরীর। ধীরে ধীরে মেঘের স্তর ভেদ করে ওরা নামতে থাকল।

মাত্র প্রাণ হারানো বেলামিয়ার দেহটা তখনো মাটিতে থেবড়ে পড়ে আছে। অভ্র থেকে আসা দুই ফুলিকার একটির সূক্ষ্ম ও কারণশরীর সেই ভাঙা বেলামিয়ার দেহে প্রবেশ করল। রুপাই বেলামিয়ার দেহটা হাতে তুলে নিয়ে তাকিয়ে থাকল। “আহারে!”

যে স্পর্শগুণ দুই ফুলিকার সূক্ষ্মদেহকে মাটিতে নেমে আসার শক্তি দিয়েছে, সেই একই স্পর্শগুণ রুপাইয়ের সূক্ষ্মদেহকে অভ্রে যেতে প্রস্তুত করে তুলল।

রুপাইয়ের সূক্ষ্মশরীর সেই দ্বিতীয় ফুলিকা শামুকের সঙ্গ ধরে যখন পৌঁছল, অভ্রে তখন বিকাল।

পৃথিবীতে, রুপাইয়ের স্থূল দেহ তখন বেলামিয়া শামুকটা হাতে দাঁড়িয়ে আছে। তার গালের একপাশ সোনারঙ করে তুলেছে সূর্যের আলো। আমি তখনও ওকে ছাড়িয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছি। চোখ পশ্চিম দিগন্তের দিকে। দূরে উড়ে যাচ্ছে গিরিয়া হাঁসের দিল। এরই কয়েক সেকেন্ড পর রুপাই ডাক শুনে পেছনে তাকিয়েছিলাম। 

নরসিংহ অংশু, নৃসিংহী আলোর মুখের ভাঁজ বয়সের কথা বলছে। শেষবার তাদের ছেড়ে যাওয়ার সময় দুজনই ছিল রুপাই-মিরাইয়ের সমবয়েসী। এই অশথচাঁপার কাছে এসে ওরা বিদায় নিতো। মেঘের আড়ালে হারিয়ে যেত অংশ আর আলোর দুটো উদ্বিগ্ন মুখ। ওদের জন্যে ভাবনা হতো মিরাই আর রুপাইয়ের। ওরা ভালো থাকবে তো? এভাবে থাকবে তো? অভ্রের পরিবেশ অংশু আর আলোর জন্যে বৈরি হয়ে উঠছিল ক্রমশ। মিরাই, ওরা ভালো আছে। ওরা একসঙ্গে বুড়ো হয়েছে।  

রুপাই  মুখ তুলে তাকাল অশথচাঁপার বিশাল চাঁদোয়ার দিকে। পাতায় আর গোপন পুষ্টিরেখার মতো অগণিত শিরা-উপশিরার মতো ডালপালায় ঘন করে ছাওয়া। পাতাগুলো বিকেলের আলো ফেরাচ্ছে। পানপাতার মতো তাদের আকার, আর শেষভাগ টিকটিকির লেজের মতো লম্বা। লেজের অংশটা বাতাসে তিরতির করে কাঁপছে। এরই আঁজেভাঁজে লুকিয়ে আছে ফুলিকারা। তাদের খোলের রঙ ঠা-া হলুদ আর গাঢ় খয়েরি রঙে মেশানো, ডোরাকাটার মতো নকশা। ঠান্ডা হলুদ রঙটা ওদের ফুলের ভিড়ে আড়াল করে রাখে। আর বাকলের খাঁজে খাঁজে লুকিয়ে থাকতে দেয় খয়েরি রংটা। ওদের দেখা পাওয়া সহজ নয়।

“ফুলিকা! ফুলিকা!”

যতদূর শুনেছি ফুলিকাদের অস্তিত্বচিন্তা সামষ্টিক। তাই একনামে যে কেউ সাড়া দেয়। তবে যাকে ডাকা হচ্ছে, তার কাছেও বার্তা পৌঁছে যায়। আমরা দেখি ওরা ধীরে চলছে। যা দেখি না তা হলো নিজেদের ভেতর ওরা বেতার তরঙ্গে সারাক্ষণ উচ্চ-যোগাযোগ রাখছে। ওদের একেটা শরীর একেটা জৈব বেতারযন্ত্র।

এ ব্যাপারে আমার নিজেরও দুটো কথা আছে। আমার ধারণা প্রতিটি শরীরই জৈব বেতারযন্ত্র। আর পরস্পরের কাছে তরঙ্গ প্রবাহের মাধ্যম হলো কারণশরীর। আমার ধারণা, সূক্ষ্মশরীর ব্যক্তির, আর কারণশরীর সমষ্টির। আমার সূক্ষ্মশরীরের নামও সাহস, কিন্তু কারণশরীরের নাম নেই। ওর সূক্ষ্মশরীরের নাম রুপাই, কারণশরীরের নাম নেই। ওটা সাধারণ। ওই সাধারণে ভর করেই রুপাই যা বলে-না, সে কথাও আমার কাছে চলে আসে। আমার না-বলা কথাও তার কাছে চলে যায়।

“ফুলিকা!” গলার রগ চড়িয়ে ডাকল রুপাই।

যখন অশথচাঁপায় ফুল হয়, ফুলিকার প্রিয় খাবার সেই ফুল। পৃথিবীতে যখন আষাঢ়-শ্রাবণ, অভ্রে তখন সাঁঝবর্ষা ঋতু।

অভ্রের ঋতু নিয়ে একটু বলি। ওখানে ঋতু মূলত দুটো। বর্ষা আর শরৎ। তবে বর্ষার আছে পাঁচ প্রকার, আর শরতের তিন। এই নিয়ে ঋতু দাঁড়িয়েছে আটটি। আলোবর্ষা, সাঁঝবর্ষা, অনলবর্ষা, ধরাবর্ষা, খরাবর্ষা। কুসুম শরৎ, শীতল শরৎ, ললিত শরৎ।

সাঁঝবর্ষায় সবুজ তিলানসিয়া মসে ছেয়ে যায় অভ্রের প্রায় সব গাছের শরীর। তখন ফুলের ওপর চাপ কমে, কারণ শামুকের প্রিয় খাবার হয়ে ওঠে ওই স্প্যানিশ মস। পৃথিবীর ভাদ্র আশ্বিনে অভ্রে যখন অনলবর্ষা ঋতু, গাছের শরীর থেকে তিলানসিয়ারা ঝরে পড়তে শুরু করে। হঠাৎ সংখ্যায় বেড়ে ওঠা ফুলিকারা তখন মারা পড়তে থাকে, কারণ খাবার হিসেবে ওরা তিলানসিয়ায় এতো বেশি অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে অশথফুল-ফলের কাছে আর ফিরতে পারে না। ফুলিকারা ঝরে পড়তে থাকে মেঘের ওপর। এবং পৃথিবীতে তখন সমুদ্রঘেঁষা লিসবন থেকে ভ্যালেন্সিয়া, দীঘা থেকে মহেশখালী, ম্যাডেলিন থেকে সান্তো দোমিঙ্গো শামুকবৃষ্টি হয়।

আরেক শ্যাওলা জন্মে, স্পোরা। স্পোরার মাঝখানটা মশার রক্তভরা পেটের মতো ফুলে ওঠা, ভেতরে সবুজ শ্যাওলারস। রক্তের বিকল্প হিসেবে অভ্রের সাদা জোঁকের প্রিয় খাবার হয়ে ওঠে স্পোরার নোনতা রস। অনলবর্ষায় যখন স্পোরারা ঝরে পড়ে, লাখো মৃত সাদা জোঁক সাদা শ্রাবের মতো কানাগাওয়া থেকে শিজুওকার রাস্তায় ঝরে পড়তে থাকে।

পৃথিবীতে যখন পৌষ, শুরু হয়ে গেছে পরিযান, অভ্রে তখন কুসুম-শরৎ ঋতু। তীব্র ঠাণ্ডার দেশ থেকে পাখিরা উড়ে চলে অল্প ঠান্ডার দেশে।

পাখসাট-পাখসাট! পাখসাট-পাখসাট!

পাখিরা দিনে ওড়ে সূর্য দেখে, রাতে ওড়ে চাঁদ, ধ্রুবতারা দেখে। কোনো কোনো জোছনারাতে অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। পরিযায়ী হাঁসেরা অভ্রে ঢুকে পড়ে। এখানে জোছনার ভূমিকা আছে আমি নিশ্চিত। কারণ অন্য সময় এমনটা কখনো হয় না। ফুলিকারা মূলত নিশাচর। একেক রাতে যখন পাখিদের বিপুলা ঝাঁক অভ্রে ঢুকে পড়ে, ফুলিকারা লুকিয়ে পড়ে। ফুলের আড়ালে, ডালের আড়ালে, বাকলের রঙে।

সাদা জোঁকেরা আরো অরক্ষিত হতে পারত। কিন্তু অরক্ষিত হওয়ার অতিরিক্ত সম্ভাবনাই ওদের বাঁচিয়ে দেয়। জোছনায় ওদের সারা শরীর ঝিমমিক করতে থাকে। পাখিরা অজানা জগতে অজানার ভয়ে ওদের মুখে তোলে না।

ঝাঁকের পর ঝাঁক ইন্দ্র পর্বতমালার আড়াল হয়ে গেলে ফুলিকারা আবার বের হয়। 

অংশু বলল, “এখনো রাত নামেনি রুপাই। আর ডেকো না।”

“আমি একটু কিছু বলতে চাইছিলাম।”

“তোমার কৃতজ্ঞতা পৌঁছে গেছে ওদের কাছে।”

আলো তার আঙুলের বৃত্ত বন্ধ করল, অদৃশ্য হলো মিরাইয়ের কারণশরীর। আলোর এলিয়ে পড়ল অংশুর বাহুর ওপর। অংশু আগলে ধরল তাকে।

“আলো! ঠিক আছ?”

“বয়েস হয়েছে যাই বলো,” বলল আলো।

“বয়সের দোষ, আর প্রকৃতির স্মৃতির দোষ নেই?”

“তা আছে।”

“প্রকৃতির স্মৃতি!” বলল রুপাই। আয়ুক্ষয়কারী প্রকৃতির স্মৃতির কথা তার মনে পড়ে গেছে। হাত জোড় করে বলল, “আলো, আপনি প্রকৃতির স্মৃতি ব্যবহার করবেন না আর।” অংশুর দিকে ফিরে বলল, “ওকে প্রকৃতির স্মৃতি ব্যয় করতে নিষেধ করুন অংশু। আমি হাতজোড় করছি।”

“করে নাতো সচরাচর,” বলল অংশু। “তবে তোমার আর মিরাইয়ের ব্যাপারটা নিয়ে ও বেপরোয়া।”

রুপাই বলল, “আমার দোষে মিরাইয়ের সূক্ষ্মশরীরটা আলাদা হয়ে গেছে।”

“ধুর পাগল!” ধমকে উঠল অংশু। বাতাসে তার হলদে কেশর এলোমেলো হয়ে উঠল। “নিজেকে আর দোষ দিয়ো না। তাহলে ওকে ফেরানোর শক্তি হারাবে।”

“ওকে ফেরানো কি সম্ভব?”

আলো বলল, “তুমি যদি এ প্রশ্ন করো, তাহলে কুমিল্লা মেডিকেলের ওর দেহ কেন রক্ষা করছ?”

রুপাই তার পায়ের পাতার দিকে তাকাল। অংশু বলল, “শক্তির প্রয়োজন। দোষ তোমার যদি কিছু থাকেও-,”

“আ-হ! এসব কি অংশু?” বলল আলো। বিস্ময়ে তার চোখ বড় হয়ে গেছে। কণ্ঠে অবদমিত হতাশা।

অংশু বলল, “বড় কষ্ট থেকে বলছি আলো।”

“তবু উচিৎ হয়নি।”

“ক্ষমা করে দিও,” বলল অংশ আলোর দিকে চেয়ে। তারপর রুপাইয়ের দিকে ফিরে বলল, “ক্ষমা কোরো, রুপাই।”

রুপাই প্রকৃতির নিয়মকে অস্বীকার করতে চেয়েছিল, এবং প্রকৃতি তার নীতি রক্ষা করেছে। বন্ধু হিসেবে আমরা ওকে বুঝি। ওর চাওয়াটা বুঝি বলে ওর ক্ষতটাও আমাদের ব্যক্তিগত। আবার ওর যেটুকু অসংযম, সেটুকু আমাদের প্রত্যেককেই পোড়ায়, এবং কখনো কখনো তা ব্যক্ত হয়ে যায়। আমার নিজেরই কতবার সংযম হারিয়ে গেছে। মাশা হারিয়েছে আরো আগে।

আলো বলল, “তুমিই তো বলো, সত্যিই ভালো যে বাসে, সে সবার ভালোবাসার দাম জানে।”

অংশু বলল, “রুপাই, দুর্বলতার কথা বলছিলে। দুর্বলতা কার নেই? সবারই আছে। তাই বলে টান কখনো মিথ্যা না। ওই টান যে বিভবটা তৈরি করে, সেটাকে জমা রাখো। ওটা তোমার শক্তি।”

রুপাই মুখ ফিরিয়ে ফুলিকা শামুকের দেহ দুটির দিকে তাকাল। রুপাইকে যে নিয়ে এসেছে, তার শরীরটা আবার সচল হয়ে উঠেছে। ঠা-া হলুদ আর খয়েরির ডোরাকাটা খোল একটু একটু করে এগিয়ে চলেছে অশথচাঁপার গুঁড়ির দিকে। অপর দেহটা পড়ে আছে স্থির। বেলামিয়ার শরীরে প্রবেশ করেছে যার সূক্ষ্ম আর কারণশরীর। মৃত পোষকের শরীর থেকে বের হতে ওর সময় লাগবে, আয়ুরও অনেকটা খরচ হয়ে যাবে।

তাদের জন্যে ত্যাগ স্বীকার করেছে ফুলিকা। ভালো যে বাসে, সে অপরের ভালোবাসার মূল্য জানে। 

নরসিংহ বলল, “আবার এসো।”

অংশু কিছু একটা বলতে গিয়েও আটকাল। আলো তার হাত চেপে ধরে হাসছে। দুজনে রুপাইয়ের দিকে ফিরে বলল, “বিদায়।”

দুটো উদ্বিগ্ন সিংহমুখ রুপাইয়ের সূক্ষ্ম চোখে ভাসছে। আলোর গলায় পার্বতীময়ূরের পেখমপুচ্ছ একবার ঝিকিয়ে উঠল।

অভ্রে পায়রাময়ূরীরা গর্ভবতী হলে পুরুষদের পেখমপুচ্ছ ঝরে যায়। মখমলি লালের মাঝখানে হলুদ সূর্যের মতো বৃত্ত। অভ্রে এ পেখমপুচ্ছ অমূল্য। শুধু কোনো পায়রাময়ূর যদি চায়, কাউকে উপহার দিতে পারে। অভ্রের সবচেয়ে সমৃদ্ধ রাজ্যগুলোর একটা ময়ূরসিংহ রাজ্য। সেই রাজ্যের দুটি জাতি নৃসিংহ আর পায়রাময়ূর। ওরা ময়ূরসিংহ নামে একই প্রাণি থেকে বিবর্তিত। অভ্রের গণগ্রন্থাগারে এ নিয়ে বিস্তর লেখাপত্র আছে।

“এসো,” হাত নেড়ে আবারও বলল দুজন।

অংশু, আলো, রুপাই, ফুলিকা, গিরিয়া আর মিরাইযের ফিরোজারঙা কারণশরীর আমার চোখে ভাসছে। কথা শেষ হলো। বিছানার পাশে ছোট্ট টুলে ঠা-া গ্লাসটা নামিয়ে রাখল রুপাই। আমি ওর চোখে তাকিয়ে আছি। ওখানে মৃদু জলের আভাস। দুই ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল গালে।

“রাবিশ!” রুপাই বিরক্ত নিজের ওপর।

প্রায়ান্ধকার ঘর। ৮৫২ হার্জের সলফেগিও সুর চলছে। কেমন ঘোরলাগা প্রেমজাগানিয়া। আমি শব্দ কমিয়ে দিলাম।

রুপাই বলল, “সাহস, তুমি আছ আমার সঙ্গে? মিরাইকে ফিরিয়ে আনব?”

বললাম, “না নেই।”

রুপাই বলল, “স্যরি, আমার জিজ্ঞেস করাটা অন্যায় হয়েছে। তুমি আছ আমার সঙ্গে। কিন্তু মাশা?”

মাশা। মনে পড়ল “ভালো যে বাসে” তত্ত্ব। যে মা শুধু নিজ সন্তানকে ভালোবাসে, সে শুধু মা-প্রাণি। সন্তানের ভালোবাসায় পৃথিবীর সমস্ত ভালোবাসাকে অনুভব করে যে অপরের সন্তানকেও আঁচল পেতে দেয়, সে উত্তীণর্, মা-মানুষ। যে প্রেমিক অভিমান করে ছেড়ে যায়, সে প্রাণি। যে ছেড়ে যাওয়ার মতো অভিমানের মূল্যটা জানে, সে জানে অপেক্ষায় থাকা প্রেমিকা কত বড়। ছেড়ে সে প্রেমিক যেতে পারে না। প্রাণি স্তর থেকে উৎরে তখন সে মানুষ।

মিরাইয়ের মৃত্যুর পর বন্ধুর জন্য আমি নিজেকে উৎসর্গ করেছি- আমার মনে এ-ই ছিল প্রকট। মাশা যে আমার জন্যে নিজেকে উৎসর্গ করেছিল তা প্রচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। মাশাকে গোছানোর সুযোগ দিয়ে আমি তাকে এলোমেলোই করেছি। তবু আমায় ছেড়ে যায়নি ও।

শোধরানোর সুযোগ যদি রুপাইয়ের থাকে, আমারও আছে। বললাম, “মাশা আমার রত্ন। ওকে আমি চিনেছি। তোমার সঙ্গে যদি থাকি, ও সহই থাকব। এক ভুল দুবার করব না।”

রুপাই হাসল, “চলো এগিয়ে দিই তোমাকে।”

“নামতে হবে না তোমার।”

রুপাইকে ওর দরজায় রেখে আমি নিঃশব্দে বেরিয়ে এলাম।

বাবা আসার বেশি দেরি নেই। গিয়ে ভাত চড়াতে হবে।

বাবার প্রশ্নে মাথা থেকে অভ্র সরে গেল। মনে হিসেব চলতে থাকল, সেদ্ধ নাজির চাল ফুটতে বেশি দেরি হবে না। দুপুরে রান্না করা সবজিটার কিছু অংশ আছে, তা দিয়ে চলবে। টাকি মাছ দিয়ে চিচিঙ্গা বরবটি সবুজ করে রান্না। নাকে এলো ধনেপাতার ঘ্রাণের সঙ্গে মিশে যাওয়া সর্ষের তেলছোঁয়ানো ঝাঁঝাল সুঘ্রাণ।

একটা এপেটাইজার লাগবে। ফ্রিজে পটল আছে, ছিলে, তেলে লবণ ছিটিয়ে ছেড়ে দিলেই চলবে, স্বপ্ন স্বপ্ন সিজলিং!

পটলভাজাটা দুজনেরই খুব প্রিয়। 

Series Navigation<< উপন্যাস।। পার্পল সন্ধ্যা।। হামিম কামাল।। পর্ব দুইউপন্যাস । পার্পল সন্ধ্যা । হামিম কামাল । ১ম খণ্ড, অধ্যায় ৪ + ২য় খণ্ড , মাশা : বৃহস্পতিবার >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *