ধারাবাহিক উপন্যাস// কবি আসছে // ফারুক আহমেদ // পঞ্চম পর্ব

This entry is part 5 of 10 in the series কবি আসছে || ফারুক আহমেদ

রাত আটটা নাগাদ লালমাটিয়া পৌঁছে যায় পিয়াল। রোড নাম্বার দেখে দেখে টিপু সুলতানের বাসা পেতে খুব বেশি সময় লাগে না। তবে বাসার সামনে এসে সে একটু সংশয়ে পড়ে যায়, ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, এটাই কি-না। দোতলা বাড়ি, সামনে বড় লন, তারপর উঁচু দেয়াল। বাইরে থেকেই টের পাওয়া যায়, এ বড়লোকের বাড়ি। পিয়াল কেমন জানি একটা অস্থির আনন্দ বোধ করে, বিড় বিড় করে বলে, টিপু সুলতান, আপনি শুধু কবি নয়, বড়লোকও।
গেইটে গিয়ে দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে, এটা কি টিপু সুলতান ভাইয়ের বাসা?

  • জি স্যার।
  • টিপু ভাইকে বলেন পিয়াল সাহেব এসেছে। পিয়াসের গলার স্বর শক্ত হয়।
    দারোয়ান ইন্টারকমে ফোন সেরে পিয়ালকে বলে, স্যার, ভেতরে যান। এই জাফর, স্যারকে ভেতরে নিয়ে যাও।
    পিয়ালকে নিচতলার একটি ড্রয়িংরুমে বসিয়ে কাজের লোকটি চলে যায়। বিশাল ড্রয়িংরুমের এককোণে পিয়াল বসে দেয়ালের দিকে চোখ রাখে। নানারকমের পেইন্টিং দেখা যাচ্ছে দেয়ালে দেয়ালে। কিন্তু পিয়াল ঠিক চিনতে পারে না, এগুলো কার আঁকা। সবমিলিয়ে জনা তিরিশেক লোক বসতে পারবে একসঙ্গে ডয়িংরুমটায়, পিয়াল বসে বসে তার হিসাবও কষে। পিয়াল জানত টিপু সুলতান পয়সাওয়ালা কবি। কিন্তু পয়সাওয়ালা মানে এই, তা সে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি। এরই মধ্যে হুট করে টিপু সুলতান এসে বলে, হ্যালো পিয়াল, আপনিই একমাত্র অতিথি যে যথাসময়ে এসেছে। আমাদের এটা লেট নাইট পার্টি, ফলে আটটা মানে আটটা নয়। বলে টিপু সুলতান হা হা হা করে হাসতে থাকে।
    পিয়াল যথারীতি লাজুক এবং বিনয়ী, আমি ভাবলাম একটু আগেই যাই, যদি কোনো সহযোগিতা লাগে আমার।
  • আচ্ছা। আমার এখানে অবশ্য তার দরকার পড়ে না। বাসার ম্যানেজারকে লিস্ট ধরিয়ে দিলেই হয়, সে-ই সব কাজ করে ফেলে। আচ্ছা আপনি বসেন, এক্ষুনি সবাই আসতে শুরু করবে। এই বলে টিপু সুলতান ভেতরে চলে যায়।
    পিয়াল সোফার এককোণে বসে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখে জিন্স আর টি-শার্টে একজন নারী এসে ঢোকামাত্র টিপু সুলতান ডয়িংরুমে এসে হাজির হয়, ও মাই গড, রুবাবা, হাউ সুইট, কী সুন্দর লাগছে তোমাকে!
  • থ্যাঙ্কু টিপু। গাল বাড়িয়ে দিয়ে টিপুর গালের সঙ্গে আলতু স্পর্শ দেয়।
  • ভেতরে চলে আসো। বলে টিপু রুবাবার হাত ধরে ভেতরে নিয়ে যায়।
    পিয়াল বসে থেকে পারফিউমের ঘ্রাণ টের পায়। রুবাবা মানে আর্টিস্ট রুবাবা, তা-ই তো। পিয়াল নিজে নিজে হিসেবে কষে। রুবাবার সঙ্গে পেইন্টিং নিয়ে পিয়াল একদিন কথা বলেছে। ধানমন্ডির ২৭ নাম্বারে রুবাবার একটা প্রদর্শনী চলছিল। পুরো প্রদর্শনী জুড়ে নারী আর নারী তবে বাস্তবে নয় দেয়ালে দেয়ালে শোভা পাচ্ছিল। ‘নারীর গোপন কথাটি’ শিরোনামের সে প্রদর্শনীতে গিয়ে রুবাবার সঙ্গে দেখা হয়নি। পরে ফোনে কথা বলে একটা ছোট রিভিউ সে লিখেছিল, ‘দিন দিন প্রতিদিন’-এর সাহিত্য সাময়িকীতে। তার সৌন্দর্যের কথা এ শহরে বিরাট চালু। পিয়াল ভাবে, পরিচয়টা আজ করে নিবে। সে কলিম স্যারের মুখে রুবাবার কথা শুনেছে, কবি মোহাম্মদ আলীর মুখে রুবাবার কথা শুনেছে এমন অনেক সাহিত্যের শীর্ষদের মুখে রুবাবার কথা শুনেছে বৈকি?
    একে একে সবাই আসতে শুরু করল। এলেন কবি মোহাম্মদ আলী। এরপর এলেন ড. হামযা, গল্প লিখেন, তার থেকে বেশি বলেন টেলিভিশনগুলোতে নানা বিষয়ে, মাঝেসাঝে প্রবন্ধও বলেন, লেখার যেহেতু সময় পান না। আস্তে আস্তে পুরো ড্রয়িংরুম বাঘা বাঘা লোকে ভরে গেল। তবে ইয়াকুব আলী যে আসবেন, এটা একদমই আশা করেনি পিয়াল। ইয়াকুব আলীকে দেখে পিয়াল চনমনে হয়ে ওঠে, আজ রাতটা সে সুবর্ণরাত হিসেবে মনে করতে শুধু করে। ইয়াকুব আলী হলেন, নন্দনতত্ত্ব পরিচালনা কমিটির প্রধান। বাঙালির নন্দনতত্ত্ব যে এক জায়গার স্থবির হয়ে ছিল। অথবা সাহিত্যের ভেতর থেকে, শিল্পের ভেতর থেকে নন্দনতত্ত্ব উদ্ধার করে তা পাঠকের সামনে যে তুলে ধরাটা জরুরি, তা নিয়ে কেউ মাথাই ঘামাচ্ছিল না। ইনি দায়িত্ব পেয়ে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন, জীবনে নান্দনিকতাবোধ কতটুকু জরুরি। এর ফলে উনি একটা বড় প্রজেক্ট প্রাপ্ত হন। এই প্রজেক্টে কিছুদিন ধরে হুড়মুড়িয়ে লোক ঢুকে যাচ্ছে। ইয়াকুব আলী চাচ্ছেন সেরা লোকটাই আসুক। কিন্তু নন্দনতত্ত্ব এমন এক আপেক্ষিক বিষয় এবং তার এমনই ক্যামুপ্লেজ যে, প্রকৃত লোকটা পাওয়া কঠিন। এ জায়গায় পিয়াল কিন্তু ১০০-তে একশ, একশ না হলেও ৯০ তো বটেই। বাংলা সাহিত্যের জীবিত-মৃত প্রায় প্রধান সব লেখকের জন্ম-মৃত্যু তার মুখস্থ। জীবিত সবারই, সবার বলতে যারা মাঠে আছেন, তাদের সব বইয়ের নাম মুখস্থ। আর তার রবীন্দ্রনাথের অনেকগুলো প্রবন্ধ পড়া আছে। এরকম আরো অনেক কাণ্ড তার করা আছে। ফলে আজ রাতটা সে সুবর্ণরাত হিসেবে নিতে চায়।
    যাহোক, একে একে সবাই আসছেন। কবিতা, কথাসাহিত্য, চিত্রশিল্প, নন্দনতত্ত্ব, নাটক এভাবে একে একে সব এসে পুরো ডয়িংরুমটা ভরে গেল। পিয়াল আশ্চর্য হয়ে দেখল সমসাময়িক বুদ্ধিবৃত্তির পুরো ভারটা এসে জড়ো হয়েছে এই টিপু সুলতানের ড্রয়িংরুমে। পিয়াল আবারও সামান্য আফসোসে ডোবে। বিড়বিড় করে বলে, টিপু সুলতান শুধু একজন কবি নয়, তিনি সুলতানও।

সবার শেষে আসেন স্যার, স্যার মানে সবার স্যার, কলিম স্যার। কলিম স্যার এলেন সবার শেষে। না সবার শেষে এল আসলে কবি শিলা কুমকুম তার সৌন্দর্য নিয়ে। কুমকুমকে দেখে পিয়াল একটু নড়েচড়ে বসে, তার মনে হয়, এই অচেনা মৃদু রাতের হাওয়ায় একজন আপাত চেনা মানুষ এসে হাজির হলো বুঝি। যদিও অন্যদের প্রায় সবাই পিয়ালের চেনাই।
পার্টি শুরু হলো, টিপু সুলতান বললেন, চলেন সবাই খোলা হাওয়ায় গিয়ে দাঁড়াই, রাতটা উপভোগ করি, আকাশ আমাদের দেখুক। এভাবে তিনি তাঁর কাব্যময় হৃদয়ের আভা দেখালেন অতিথিদের।

লনটা সবুজ ঘাসে মোড়ানো একটা আভিজাত্যতায় ডুবে আছে। দেয়ালের একপাশে টেবিলে পাশাপাশি
খাবারের পাত্রগুলো মুখ ঢেকে বসে আছে। পাশের টেবিলে গ্লাস, সফট ড্রিঙ্কস, তার পাশে কফি মেকার ইত্যাদি। একটা জৌলুসের আভা আলো-আঁধারির এই লনে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
লনের এক কোনায় কলিম স্যার আর ইয়াকুব আলী গ্লাস হাতে কথা বলছেন। দেখে মনে হচ্ছে, খুব ফুরফুরে আছেন দুজনই। তাদের সঙ্গে যোগ দিল টিপু সুলতান। টিপু সুলতানের পেছন পেছন এক বেয়ারা ট্রেতে করে কয়েকটা স্পিংরোল নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। টিপু সুলতান ওয়েটারের থেকে একটা প্লেট টেনে কলিম স্যারের সামনে ধরলে স্যার একটা রোল তুলে নেন। এরপর ইয়াকুব আলীর দিকে প্লেটটা বাড়িয়ে দিলে তিনিও একটি স্পিংরোল তুলে নেন। ওয়েটার চলে গেলেও টিপু সুলতান থেকে যায়।
তাদের গ্লাসে যে মৃদু লাল রঙের আভা আলো-আঁধারির ভেতর দিয়েও টের পাচ্ছে, তার সূত্রটা
কোথায় তা খোঁজে পিয়াল। যে টেবিলে সফট ড্রিঙ্কস সেখানে নজর ফেলে কিছু পায় না। যাহোক এসব ভেবে কী হবে, এই প্রথম এমন একটা লেট নাইট পার্টিতে পিয়ালের সুযোগ হলো। এ তো শুধু লেট নাইট নয়, শিল্প-সাহিত্য নন্দনতত্ত্বেরও। সুতরাং এখানে এসে কোনো মতেই নিজেকে অপ্রস্তুত করতে ইচ্ছুক নয়। ঠাণ্ডা মাথায় পুরো ব্যাপারটা নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসতে চায় পিয়াল।
অদূরেই কথা বলছিল ড. হামযা আর কবি মোহাম্মদ আলী। এর মধ্যে দেখা গেল ড. হামযা ঝরে গেলেন। ঝরে গেলেন মানে কবি মোহাম্মদ আলীকে রেখে হাঁটা দিলেন গোল হয়ে থাকা কলিম স্যার, ইয়াকুব আলী আর টিপু সুলতানের বৃত্তে। অবশ্য ড. মাহযা কেন, পার্টিতে আসা প্রায় সবারই নজর ওই দুজনের দিকে। কিন্তু সাহস করে অনেকে যেতে পারছে না। যাহোক, ড. হামযা চলে যাওয়ায় হঠাৎ করেই একা হয়ে গেলেন মোহাম্মদ আলী। কবি হিসেবে তাঁর যে নাম তাতে দু-একজন তো ঘিরে ফেলারই কথা। কিন্তু সে সুযোগ না দিয়ে পিয়াল খুব দ্রুত সে শূন্যস্থান পূরণে সক্ষম হলো। আর যথারীতি খুব জড়োসড়ো হয়ে সালাম দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল পিয়াল।

  • কী খবর পিয়াল? মোহাম্মদ আলীর স্বরে মনে হলো কিছুটা জড়তা আছে, আবার মনে হচ্ছে জড়তা নাই। পেটে বোধহয় বেশিই পড়েছে…।
    পিয়াল বলে, স্যার একটা কথা ছিল।
  • এই পার্টিতে আবার কথা কী? অন্য কিছু হলে বলো।
  • না মানে স্যার, আপনার ‘তপস্যা’ সিরিজের কবিতাগুলোর যে ভার, তার তুলনা হয় না। কিন্তু আমি অনেকদিন চেষ্টা করেছি, আপনাকে পেলে একটা প্রশ্ন করব?
  • কী প্রশ্ন বলো, তপস্যা সিরিজে যে নারী এসেছে সে আমার কে, তা-ই তো?
    পিয়াল মাথা নিচু করে ফেলে। মনে হলো খুব লজ্জা পেয়েছে। সে একটু থেমে বলে, আমার প্রশ্নটা হলো, আপনি কেন এই সিরিজের মাত্র ১৩টি কবিতা লিখে থেমে গেলেন?
  • তেরোটি কি কম, বাছাধন। মোহাম্মদ আলীর কথায় কৌতুক টের পাওয়া যায়।
  • কম তো অবশ্যই। আমরা বন্ধুরা বহুদিন বিকালে ক্যাম্পাসের মাঠে বসে এ নিয়ে তর্ক করেছি। কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারি নাই, কেন আপনি ১৩টি লিখলেন, এটা বেড়ে হওয়া উচিত ছিল ১০০টিতে। আর তা-ই যদি হতো, তাহলে আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাস পাল্টে যেত।
  • তা-ই নাকি? তার মানে ১৩টিতে পাল্টায়নি, তা-ই তো?
  • স্যার পাল্টেছে, নতুন একটা সংযোজন হয়েছে বাংলা কবিতায়, নগ্নতা ধরা দিয়েছে পবিত্র হয়ে। কিন্তু শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, নির্মলেন্দু গুণ এই নামগুলো যেমন আপামরের কাছে চলে গেছে, আপনারটা যায়নি। যায়নি কারণ আপনি নিভৃতচারী। আর না হয় সবার আগে উচ্চারিত হতো মোহাম্মদ আলী, শামসুর রাহমান নয়।
  • হা হা হা। এমন একটি হাসির আওয়াজ বেরুল মোহাম্মদ আলীর মুখ থেকে যে, সে আওয়াজে আশেপাশের অনেকেই তাকিয়ে রইল। হাসির সূত্র ধরে কৌতূহল নিয়ে কয়েকজন এগিয়ে এল কবি মোহাম্মদ আলীর দিকে।
Series Navigation<< ধারাবাহিক উপন্যাস // কবি আসছে // ফারুক আহমেদ // চতুর্থ পর্বউপন্যাস// কবি আসছে // ফারুক আহমেদ // ষষ্ঠ পর্ব >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *