কানিজ পারিজাত এর শেষ চুমুকের আগে মনকে প্রফুল্ল করে।। নিল হাসান

একটা ভালো বই মানুষের মনকে প্রফুল্ল করে একথা বলার অপেক্ষা রাখে না মানুষের ভালো থাকার জন্য শরীরের পাশাপাশি মনের ও বিশেষ যত্নের প্রয়োজন
আর মনকে ভালো রাখার জন্য দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে অনেক বই পড়তে হয় ঠিক তেমন করেই আমার হাতে আসলো একটি বই। বইটির নাম “শেষ চুমুকের আগে” নামটা প্রথমে একটু খটকা লাগল ভুল করলাম নাকি পরে দেখলাম না ঠিকই আছে
“শেষ চুমুকের আগে” লিখেছেন কবি কানিজ পারিজাত এটি একটি কবিতার বই যদিও তাঁর কবিতার সঙ্গে আমি পরিচিত নই আমি তাকে প্রথম একজন গল্পকার হিসেবে চিনেছি এবং “শেষ চুমুকের আগে” এটি তার প্রথম কবিতার বই এই বইয়ের রচয়িতা একাধারে একজন কবি এবং গল্পকার যদিও আমি তাকে প্রথম গল্পকার হিসেবে চিনতাম কিন্তু এই বইটি পড়ার পর তার কবিতা সম্পর্কে আমার ধারণা জন্মে। এমন অনেক বই আছে যেগুলো পড়তে নিয়ে কিছুটা পড়ার পর পড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলি সেই বইটি আর পড়া হয়ে ওঠেনা কি কিন্তু “শেষ চুমুকের আগে” বইটি
সেই দিক থেকে বিচার করতে গেলে এই বইটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী এবং সফল বই। বইটির প্রথম কবিতাটি পড়ার পরে আমার বেশ ভাল লেগেছে এবং তারপর একে একে সবগুলো কবিতা এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলার মতো এই দিক থেকে বিচার করতে গেলে লেখককে অবশ্যই একজন সফল লেখক বলতে হবে কারণ তিনি পাঠক ধরে রাখতে পেরেছেন এবং বইটি শেষ পর্যন্ত পড়ার মতো যথেষ্ট উপাদান বইটির ভেতরে রয়েছে। এই বইয়ের প্রথম কবিতার শিরোনাম আদিম ঘ্রাণ গতানুগতিক কবিতার বাইরে একটি অন্যরকম কবিতা যা খুব সহজেই মানুষের মন ছুঁয়ে যাওয়ার মত এখানে আমি উল্লেখ করছি কয়েকটি লাইন “আদিম ঘ্রাণ” শিরোনাম কবিতাতে কবি লিখেছেন
“রুপময়ী বলে- ‘বল তো কে ‘? / আমি বলি- ‘তুমি রূপময়ী- খোঁপায় গোঁজা চালতা ফুল’।/ -‘বল তো কে’? /-‘তুমি রূপময়ী- চোখ তোমার- বনদিঘি- ঠোঁট তোমার বুনোফুল’।/ রূপময়ী বলে -‘ফুলটোক্কা থাক,- চলো, খেলি কানামাছি’;/ আমার চোখ বেঁধে রূপময়ী বলে -‘কানামাছি ভোঁ ভোঁ আমি রুপময়ী, আমায় ছোঁও
এভাবে কবিতার মাঝে ছেলেবেলার সেই ফুল্টোক্কা খেলার সাথে যে সমন্বয় ঘটিয়েছেন এমনটা খুব কম কবি ই পারেন।
পরের কবিতাটি শুরু করেছেন এভাবে ”জুতোটা হারিয়েছে সে আগেই” এই একটা লাইনের মাঝেই অনেক গল্প লুকিয়ে আছে মুলত এই লাইনটা পরার পর কিন্তু কবিতাটা না পড়ে থাকা যাবে না।কবি যে একজন গল্পকার এই কবিতা লেখার চিত্রকল্পই বলে দেয়। তার কবিতায় উপমার ব্যাবহার লক্ষ করার মতো। যে কেউ তার কবিতা পড়লে আমার সাথে একমত হবেন যে এই বইয়ের রচয়িতা একজন রোমান্টিক প্রেমিক চিরসবুজ মনের কবি। তার প্রেমের পঙতি গুলোর মাঝে একটা নিজস্বতা রয়েছে এবং খুব সহজেই মানুষের মন ছুঁয়ে যাবে। তার লেখায় শব্দ সম্ভার বেশ সমৃদ্ধ কিন্তু কোথায়ো তেমন কোন দুর্বোধ্যতা লক্ষ করা যায় না এবং কিছুতেই মেদবহুল নয়।
এখানে ” একজোড়া চোখ” শিরোনামের কবিতা থেকে কয়েকটি লাইন উল্লেখ করছি।
“ও হ্যাঁ, আসল কথাটাই বলা হয়নি;/একজোড়া চোখ চাই…;/বিশ্বস্ত প্রেমিকের একজোড়া/ প্রেমময় চোখ।”
এখানে তার শুভ্র চাওয়াটা তার হৃদয়ের সজিবতা খুব সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে কবি যে একজন নারী লেখক তবু তার কবিতায় তেমন কোন ছাপ দেখা যায় না। অনেক লেখক ই রয়েছে যারা এই বৃত্ত ভেঙে বেড়িয়ে আসতে পারে না কিন্তু কবি কানিজ পারিজাত সেখানেও তার মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন সফল ভাবে। এমন কি তার কিছু কিছু কবিতা রয়েছে যেটা পড়লে মনেহবে কোন পুরুষ কবি লিখেছেন।আর তিনি নারী হয়ে ও পুরুষের দৃষ্টিতে সফল ভাবে কবিটার দেহ চিত্রাঙ্কন করেছেন।এক্ষেত্রেও তিনি সফল তাই বলে তিনি নারীদের যন্ত্রণাকে ও পাশ কাটিয়ে যান নি।
তিনি “পরিচয়” শিরনামে লিখেছেন
“আচ্ছা,বলো তো তুমি কে ?/ তুমি কি মিসেস রায় ?/
ছোটনু’র মা ? অর্ক-র বোন ? /নাকি…তুমি জামিল সাহেবের মেয়ে?/তোমার নিজের কোন নাম নেই ? /পরিচয় নেই ? তুমি কি নামহীনা ? /”
এভাবেই কবিতার মধ্যে দিয়ে যন্ত্রণা না পাওয়া,কখনো বিরহ আবার বিদ্রহ এমন কি স্বদেশ প্রেমের কথা ও তিনি বলেছেন। একজন প্রকৃত কবির মত তিনি সমাজের সকল অসঙ্গতি তার কবিতায় চিত্রায়িত করেছেন। কানিজ পারিজাত এর কবিতায় গ্রম বাংলার রুপ মাধুর্য সুনিপূণ ভাবে বর্ণনা করেছেন।তার কবিতায় অবহেলায় অনাদরে পরে থাকা ভাঁটফুল কে তিনি খুব সুন্দর ভাবে স্থান করে দিয়েছেন সেই সাথে পরিচিত ও করিয়েছেন বটে।এছাড়া ও চালতা ফুল, বেল ফুল এর ব্যাবহার ও দেখা যায়। কবি কথা বলবেন সবার জন্য। কবি কবিতা লিখবেন সবার জন্য। কবি কখনো কোন নির্দিষ্ট জাতী গোত্র বা দেশের জন্য নয়। প্রকৃত কবি সারা পৃথিবীর তেমনি কবি কানিজ পারিজাত। তিনি বাংলাদেশে জন্মেছেন বলে নিজেকে শুধু এই দেশের ভেতর বাউন্ডারি দিয়ে আবদ্ধ করে রাখেন নি।
তিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পিছপা হন নি।তাই তো তিনি লিখেছেন ” কালো এপিটাফ ” শিরোনামের কবিতা।
এখানে কয়েকটি লাইন উল্লেখ করছি ” আটকে আছে -আপনার পায়ের ঠিক নিচেই-/খুবই মূল্যবান -আমার একটি শ্বাস!/আপনি পা সরালেই যা আমি প্রাণভরে নিতে পারি…/”
কবিতাটি মুলত জর্জ ফ্লয়েডের উদ্দেসশে তিনি লিখেছেন। জর্জের প্রতি যে অন্যায় হয়েছে তা দেখে কবির মনকে ও ভিষণ ভাবে নাড়া দিয়েছিল।তাইতো কতটা মার্জিত ভাবে প্রতিবাদ করেছেন কতটা ব্যকুলতা ফুটে উঠেছে কবিতাতে তা পুরো কবিতাটি পড়লে বোঝা যায়। এখানে আরো লক্ষনীয় তিনি এই কবিতার চিত্রপট যেভাবে অঙ্কন করেছেন তাতে একবার ও মনে হয় না যে তিনি অন্য কোন দেশের কবি। জর্জের দেশের কবি নয়।কবিকে এমন ই হওয়া উচিৎ। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় কবি কানিজ পারিজাত একজন প্রকৃত কবি। তার কবিতায় এক অলিক টান, মোহময়তা আর মুগ্ধতা রয়েছে যা যে কাউকেই আকৃষ্ট করবে।
যেমন তিনি লিখেছেন ” অনন্তযাত্রা” শিরনামের কবিতায়
“চুইয়ে পড়া বিষাদ-জলে স্নাত হয় কেউ/লগ্নে লগ্নে বেজে ওঠে শেষের ঘন্টাধ্বনি/ হৃদয় তবু এঁকে চলে অপূর্ব ইচ্ছাচিত্র/হেমলকের পেয়ালায় শেষ চুমুকের আগে/থমকে যায় মানবী কোনো এক বুনোফুলের টানে/”
আর এভাবেই কবি কানিজ পারিজাতের বইটি পড়লে এক অমোঘ বুনো ফুলের টান অনুভব হবে।যে আবেশ
অনেক ক্ষন আচ্ছন্ন করে রাখবে।আচ্ছন্ন করে রাখবে কবিতার রূপময়ী নামক চরিত্রটি । পরিশেষে আর কয়েকটি লাইন উল্লেখ করতে চাই কবি
”বাইপাস” শিরোনাম কবিতায় লিখেছেন
“এ পথে হাঁটো না তুমি বহুদিন;/শুনেছি নতুন পথ ধরে হেঁটে যাও পূবে-বাইপাস। /মাঝে মাঝে ভাবি,আমিও বাইপাস খুঁজি;/নতুন পথ ধরে হেঁটে যাই/দক্ষিণে-পশ্চিমে-উত্তরে!/মেঠোপথটা হাতছানি দিয়ে ডাকে-/আমার আর বাইপাস খোঁজা হয় না।/”
এমনি ভাবে সব কবিতার শরীরে চিত্রকল্প একে রেখেছেন কবি এবং তার বইটি পড়তে বসে কেউ আর বাইপাস খুঁজবেন না বলেই আমি মনে করি।
একনজরে বইটি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
বই: শেষ চুমুকের আগে
লেখক: কানিজ পারিজাত
ঘরানা: বাংলা কবিতা
ধারণ : হার্ডকাভার
প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ
প্রকাশক : মূর্ধন্য
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৬৪
মুদ্রিত মূল্য : একশত পঞ্চাশ টাকা মাত্র

Leave a Reply

Your email address will not be published.